দাসপাড়ায় এখন অন্যরকম ব্যস্ততা, ঢাক ঠিক করার পালা
নিজস্ব সংবাদদাতা (পূর্বস্থলী): পুজোর আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন। কোথাও প্রতিমার শেষ মুহূর্তের কাজ, কোথাও মণ্ডপসজ্জার ব্যস্ততা। আর পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী ২ নম্বর ব্লকের পাটুলি মধুপুরের দাসপাড়ায় এখন অন্যরকম ব্যস্ততা—ঢাক ঠিক করার পালা। কারণ এই গ্রাম পরিচিত ‘ঢাকিগ্রাম’ হিসেবেই। গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঢাক এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোর পেশা। পুরুষদের পাশাপাশি এই গ্রামের বহু মহিলার হাতেও এখন দক্ষতার সঙ্গে বাজে ঢাক। কিন্তু পুজোর মুখে সেই মহিলা ঢাকিদের মুখে এবার খানিকটা হতাশার ছাপ। কারণ এখনও মেলেনি তেমন কোনও বরাত। পুজোর মরসুম এলেই এই গ্রামের ঢাকিদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তবে এবছর এখনও পর্যন্ত বাইরে থেকে বড় কোনও ডাক না আসায় চিন্তায় রয়েছেন মহিলা ঢাকিরা। গত বছর দুর্গাপুজোর সময় তারা পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর সিকান্দ্রাবাদে। সেখানে পুজোমণ্ডপে ঢাক বাজিয়ে নজর কেড়েছিলেন তারা। এবছর ওড়িশা-সহ দূরের বেশ কিছু জায়গা থেকে যাওয়ার প্রস্তাব এলেও শেষ পর্যন্ত দূরপাল্লার যাত্রার সমস্যার কথা ভেবে সেই বায়না নেননি তারা।
কারণ ঢাক নিয়ে দূরপাল্লার ট্রেনে যাতায়াত করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। বড় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ট্রেনে ওঠা, যাতায়াত এবং অন্যান্য ঝামেলার কারণে এবার দূরের বরাত কার্যত বাতিল করেছেন তারা। ফলে এখন তাদের অপেক্ষা কাছাকাছি কোনও পুজোমণ্ডপ থেকে ডাক আসার। তবে এই মহিলা ঢাকিদের পথচলা কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। এই গ্রামেরই গৃহবধূ শিখা দাস। স্বামী ও ছেলেকে ঢাক বাজাতে দেখেই একদিন তার মনে হয়েছিল—তিনিও যদি ঢাক বাজাতে পারেন! তাতে সংসারে আর্থিক সাহায্য করার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল, গ্রামের একজন মহিলা একা ঢাক বাজিয়ে কি বাইরে যেতে পারবেন? শিখা দাস নিজের ইচ্ছের কথা জানান গ্রামের অন্যান্য মহিলাদের। তাঁর সেই উদ্যোগে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন আরও অনেকে। খুকুরানি দাস, দাসীবাণী বাগ, কাজল দাস, কৈকা দাস, চামেলী দাস-সহ একে একে বহু মহিলা যুক্ত হন ঢাক বাজানোর সঙ্গে। শুরু হয় শেখার পর্ব। হাত পাকতে থাকে ঢাকের তালে। এরপর ধীরে ধীরে গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে শুরু করেন তাঁরা। গত বছর দুর্গাপুজোর সময় তো তাঁরা পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর সিকান্দ্রাবাদে। সেখানে পুজোমণ্ডপে ঢাক বাজিয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, ইচ্ছে আর পরিশ্রম থাকলে গ্রামের গৃহবধূরাও পৌঁছে যেতে পারেন অনেক দূর। আজ তাই ঢাক তাদের কাছে শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, স্বনির্ভরতারও হাতিয়ার। সংসারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছেন তারা। কিন্তু এবছর পুজোর মুখে এখনও বরাত না মেলায় খানিকটা হতাশা রয়েছে তাঁদের মনে। হাতে সময়ও আর খুব বেশি নেই। তাই শেষ মুহূর্তে যদি কোনও পুজোমণ্ডপ থেকে ডাক আসে, সেই আশাতেই এখন ঢাক ঠিক করছেন পাটুলি মধুপুরের মহিলা ঢাকিরা। ঢাক প্রস্তুত, হাতও প্রস্তুত—শুধু অপেক্ষা পুজোর সেই ডাকের।