সেই কাঠে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে জগন্নাথ দেবের রূপ। এই শিল্পী আর কেউ নন, এলাকার সকলের পরিচিত ‘বাপ্পা প্রভু’—যার আসল নাম সুদীপ সরকার। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণ শিল্পী আজ নিজের সাধনার জোরে পৌঁছে গিয়েছেন বিশ্বের দরবারে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে শখের বশে কাঠের কাজ শুরু করেছিলেন বাপ্পা। প্রথম দিকে গুরুদের কাজ দেখে শিখলেও, পরবর্তীতে নিজের সাধনা আর নিষ্ঠাই তাকে এই শিল্পে দক্ষ করে তুলেছে। ২৬ বছর বয়সী সুদীপ আজ আর কেবল স্থানীয় শিল্পী নন। তার হাতের তৈরি নিমকাঠের জগন্নাথ পাড়ি দিয়েছে সুদূর নিউজিল্যান্ডের ইসকন মন্দিরে।
বাপ্পা প্রভুর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রতিটি বিগ্রহের জন্য বেছে নেন উৎকৃষ্ট মানের নিমকাঠ, যা রাজ্যের বিভিন্ন কাঠমিল থেকে তিনি নিজে সংগ্রহ করেন। সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, তাঁর তৈরি বিগ্রহে কোনো জোড় বা পেরেক ব্যবহার করা হয় না। একটি গোটা নিমকাঠই তাঁর ক্যানভাস।
এক সময় সুদীপের কাজের পরিধি কেবল মুর্শিদাবাদেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আজ তাঁর তৈরি জগন্নাথ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মতো দেশে সমাদৃত। এই বছরেও অন্ধ্রপ্রদেশ, ব্যাঙ্গালোর, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানা থেকে এসেছে প্রচুর বরাত। রথের আগে বীরচন্দ্রপুরের একটি মন্দির থেকে এসেছে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্ডার—৪ ফুট উচ্চতার জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার সেট। বাপ্পার তৈরি বিগ্রহের দাম শুরু হয় ৯ হাজার টাকা থেকে, যা উচ্চতা ও কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা (৪৮ ইঞ্চি) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় বাপ্পার সাফল্যের অন্যতম অংশীদার তার স্ত্রী অঙ্কিতা সরকার। বিগ্রহের পোশাক ও অলঙ্করণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তিনিই সামলান। স্বামী-স্ত্রীর এই যুগলবন্দিতেই রঘুনাথগঞ্জের লোকশিল্প আজ বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল।
নিজের এই অসামান্য সাফল্য নিয়ে বিনীত শিল্পী বলেন, "আমি শুধু মাধ্যম মাত্র। মহাপ্রভুই আমার হাত দিয়ে নিজের রূপ তৈরি করিয়ে নেন।" মুর্শিদাবাদের এক সাধারণ গ্রামের তরুণ প্রমাণ করে দিলেন, নিষ্ঠা আর বিশ্বাসের জোর থাকলে শুধু মাটির নয়, কাঠের শিল্প দিয়েও বিশ্ব জয় করা সম্ভব।