প্রতিটি ম্যাচেই দলগত ফুটবলের পাশাপাশি উঠে আসছে তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স। রেলওয়ে এফসির বিরুদ্ধে লড়াইটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। খুব বেশি গোলের দেখা না মিললেও একমাত্র গোলেই নিশ্চিত হয়েছে জয়। সেই গোলটি এসেছে পেনাল্টি থেকে, আর দায়িত্বশীল ফুটবল খেলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তরুণ স্ট্রাইকার জেসিন টিকে।
স্কোরলাইন বলছে ১-০। কিন্তু ম্যাচের ভিতরে লুকিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গলের আধিপত্য, ধারাবাহিক আক্রমণ এবং গোলের আরও কয়েকটি সুযোগ নষ্ট হওয়ার আক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত জেসিনের ঠান্ডা মাথার পেনাল্টিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে বিনু জর্জের দল। এই জয় শুধু পয়েন্ট তালিকায় ইস্টবেঙ্গলের অবস্থান শক্ত করেনি, একই সঙ্গে দলের আত্মবিশ্বাসও আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরেই জেসিন টিকেকে নিয়ে আশাবাদী ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের একাধিক সিনিয়র ফুটবলার। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিদেশি ফুটবলারের উপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে ভারতীয় তরুণদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জেসিন টিকে এবং সায়নের মতো প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়মিত খেলালে ভবিষ্যতে তার সুফল পাবে ক্লাব। সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনই যেন দেখা যাচ্ছে চলতি কলকাতা লিগে। ম্যাচের পর ম্যাচ নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি প্রমাণ করছেন, বড় মঞ্চে দায়িত্ব নিতে তিনি প্রস্তুত।
রেলওয়ে এফসির বিরুদ্ধে ম্যাচেও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে দেখা যায় ইস্টবেঙ্গলকে। মাঝমাঠ থেকে বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুলছিল লাল-হলুদ। তবে শেষ মুহূর্তে গোল করার ক্ষেত্রে কিছুটা অস্থিরতা দেখা যায়। একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে ম্যাচ যত এগোচ্ছিল, ততই বাড়ছিল সমর্থকদের উদ্বেগ।
সেই সময়েই আসে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। রেলওয়ে এফসির ডিফেন্ডার সায়নের একটি ভুলের সুযোগ নেয় ইস্টবেঙ্গল। বক্সের ভিতরে ফাউল হওয়ায় পেনাল্টির নির্দেশ দেন রেফারি। চাপের সেই মুহূর্তে বল হাতে তুলে নেন জেসিন। এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিজ্ঞ ফুটবলারও নার্ভাস হয়ে পড়েন। কিন্তু জেসিনের শরীরী ভাষায় তার কোনও ছাপ দেখা যায়নি। গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। সেই একমাত্র গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফয়সালা করে দেয়।
পেনাল্টি থেকে গোল করলেও শুধু সেই মুহূর্ত দিয়েই জেসিনের পারফরম্যান্সকে বিচার করলে ভুল হবে। পুরো ম্যাচেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। কখনও ডান প্রান্তে সরে গিয়ে বল নিয়েছেন, কখনও আবার মাঝমাঠে নেমে এসে সতীর্থদের সঙ্গে আক্রমণ গড়েছেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের উপর লাগাতার চাপ সৃষ্টি করেছেন। বল ছাড়া তাঁর দৌড় এবং জায়গা তৈরি করার ক্ষমতাও নজর কেড়েছে। ফলে গোলের পাশাপাশি তাঁর সামগ্রিক পারফরম্যান্সও দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
আগের ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে আলো কাড়েন পিভি বিষ্ণু। তাঁর হ্যাটট্রিক লাল-হলুদ সমর্থকদের উচ্ছ্বসিত করেছিল। কিন্তু রেলওয়ে এফসির বিরুদ্ধে তিনি মাঠে ছিলেন না। স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণের বড় দায়িত্ব এসে পড়ে জেসিনের উপর। সেই দায়িত্ব তিনি দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। একা স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেও প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন। সুযোগ তৈরি করেছেন নিজের জন্য এবং সতীর্থদের জন্যও। ফলে বিষ্ণুর অনুপস্থিতি খুব বেশি অনুভূত হয়নি।
তবে ম্যাচ শেষে একটি আক্ষেপ থেকেই যাচ্ছে। ইস্টবেঙ্গল চাইলে আরও বড় ব্যবধানে জয় পেতে পারত। আক্রমণে আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও একাধিক সহজ সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। কখনও শেষ পাসের অভাব, কখনও আবার গোলের সামনে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে স্কোরলাইন বড় হয়নি। সমর্থকদের প্রত্যাশাও ছিল আরও বেশি গোলের। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে কয়েকটি আক্রমণ আরও নিখুঁত হলে ফল অন্য রকম হতে পারত।
তা সত্ত্বেও দলের পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ লিগের দীর্ঘ পথে সব ম্যাচ সমান সহজ হয় না। অনেক সময় সৌন্দর্যের চেয়ে তিন পয়েন্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রেলওয়ে এফসির বিরুদ্ধে সেই কাজটাই করেছে ইস্টবেঙ্গল। সুযোগ পেয়েছে, গোল করেছে, তারপর রক্ষণকে সংগঠিত রেখে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এই ধরনের জয়ই ভবিষ্যতে শিরোপার লড়াইয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। বিনু জর্জের কোচিংয়ে ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন চোখে পড়ছে দলগত ফুটবলে। শুধু কোনও এক জন ফুটবলারের উপর নির্ভর না করে গোটা দল মিলে আক্রমণ এবং রক্ষণ সাজাচ্ছে। তরুণদের উপর আস্থা রাখার ফলও মিলছে হাতে-নাতে। নিয়মিত সুযোগ পেয়ে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। মাঠে সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
জেসিন টিকের পারফরম্যান্স সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতীক। বয়স কম হলেও দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা রয়েছে তাঁর মধ্যে। গোল করার পাশাপাশি দলের জন্য পরিশ্রম করতে তিনি কখনও পিছপা হন না। আধুনিক ফুটবলে একজন ফরোয়ার্ডের কাছ থেকে শুধু গোল নয়, প্রেসিং, বল ধরে রাখা এবং সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করার প্রত্যাশাও থাকে। জেসিন ধীরে ধীরে সেই দিকগুলোতেও নিজেকে উন্নত করছেন। ফলে ভবিষ্যতের জন্য তাঁকে ঘিরে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
অন্য দিকে, কলকাতা লিগে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফলও ইস্টবেঙ্গলের পক্ষে যাচ্ছে। আগের ম্যাচেই পয়েন্ট হারিয়েছে মোহনবাগান। মেহতাব হোসেনের দলের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত জয় তুলে নিতে পারেনি সবুজ-মেরুন শিবির। ফলে লিগের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়ে গেল ইস্টবেঙ্গল। নিজেদের ম্যাচ জিতে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে লাল-হলুদ।
লিগের শুরুতে ধারাবাহিক জয় কোনও দলের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে যেমন পয়েন্ট তালিকায় এগিয়ে থাকা যায়, তেমনই ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কঠিন ম্যাচের আগে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয় ড্রেসিংরুমে। ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রেও এখন ঠিক সেই ছবিটাই দেখা যাচ্ছে। টানা তিন জয়ের পর ফুটবলারদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচ জেতানো সম্ভব।তবে কোচিং স্টাফ নিশ্চয়ই জানেন, উন্নতির এখনও অনেক জায়গা রয়েছে। গোলের সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। শেষ তৃতীয়াংশে আরও কার্যকর হতে হবে। রক্ষণেও মাঝে মাঝে অপ্রয়োজনীয় ভুল এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এমন ভুলের মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে রেলওয়ে এফসির বিরুদ্ধে জয় ইস্টবেঙ্গলের জন্য শুধু তিন পয়েন্টের সাফল্য নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তাও। তরুণদের উপর ভরসা রাখলে তারা যে দায়িত্ব নিতে পারে, তার প্রমাণ আবারও দিলেন জেসিন টিকে। ধারাবাহিক গোল, আত্মবিশ্বাসী ফুটবল এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণ করার ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত সমর্থকদের প্রিয় করে তুলছে।
কলকাতা লিগ এখনও অনেক বাকি। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কিন্তু বর্তমান ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ইস্টবেঙ্গল নিঃসন্দেহে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠবে। আর জেসিন টিকে যদি একই ধারায় পারফরম্যান্স চালিয়ে যেতে পারেন, তা হলে শুধু কলকাতা লিগ নয়, খুব শিগগিরই ইস্টবেঙ্গলের সিনিয়র দলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠতে পারেন। লাল-হলুদের ভবিষ্যৎ আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা হিসেবে তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া এখন আর কল্পনা নয়, বরং ক্রমশ বাস্তবে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।