এক ঝলক
কেন গুন্ডাদমন আইন, ব্যাখ্যা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী ২০২৭ সালের মাধ্যমিকের রুটিন প্রকাশ রাজ্যের ৬০টি রথযাত্রা কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান রাজ্যসভার উপনির্বাচনের তিনটি আসনের মনোনয়ন পেশ সুখেন্দুদের ইডির বিরুদ্ধে মামলা কালীঘাট তৃণমূলের

কলকাতা লিগে দাপুটে সূচনা মোহনবাগানের, সায়নের ঝলকে উড়ল পাঠচক্র

নিলয় সামন্ত(ইন্ডিয়ান নিউজ সার্ভিস): কলকাতা লিগের নতুন মরশুম শুরু হল মোহনবাগানের দাপুটে জয়ে। বহুদিন পর ফ্লাডলাইটের আলোয় মোহনবাগান মাঠে ফিরল সেই চেনা আবহ, গ্যালারিতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, আর শেষ বাঁশির পরে সবুজ-মেরুন পায়রো শো যেন সন্ধ্যাকে আরও স্মরণীয় করে তুলল। মাঠের লড়াইয়েও সেই আবহের সঙ্গে সুবিচার করলেন বাস্তব রায়ের ছেলেরা। পাঠচক্রকে চার গোলে হারিয়ে মরশুমের প্রথম ম্যাচ থেকেই নিজেদের শক্তির পরিচয় দিল মোহনবাগান। স্কোরলাইন বলছে চার শূন্য। কিন্তু এই ব্যবধান শুধু গোলের হিসাব নয়, ম্যাচজুড়ে দুই দলের পার্থক্যেরও প্রতিফলন। বিশেষ করে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারফরম্যান্স আলাদা করে নজর কেড়েছে। গত মরশুমে লাল-হলুদ জার্সিতে দুরন্ত ছন্দে থাকা এই ফুটবলার দলবদলের পর সবুজ-মেরুন শিবিরে যোগ দিয়েছেন।
Ganamadhyam
14 July, 2026
নতুন জার্সিতে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচেই বুঝিয়ে দিলেন, রং বদলেছে, খেলার ধার নয়। বাঁ দিক দিয়ে তাঁর দৌড়, গতি, ড্রিবল এবং সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা গোটা ম্যাচে পাঠচক্রের রক্ষণকে বারবার বিপাকে ফেলেছে। শেষ পর্যন্ত নিজের নামও তুলেছেন গোলদাতার তালিকায়।
মোহনবাগানের কোচ বাস্তব রায় এই প্রতিযোগিতাকে শুধুই লিগ হিসেবে দেখছেন না। সিনিয়র দলের একাধিক ফুটবলারকে ম্যাচের ছন্দে ফেরানো এবং তরুণদের নিজেদের প্রমাণ করার মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করতে চাইছেন তিনি। সেই কারণেই প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন কিয়ান নাসিরি, সুহেল আহমেদ ভাট, দীপেন্দুদের মতো ফুটবলাররা। ম্যাচের শুরুতে অবশ্য দলকে কিছুটা সময় নিতে হয়েছে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেতে। পাঠচক্রও প্রথম থেকেই সংগঠিত ফুটবল খেলেছে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে। সৌভিক অধিকারীদের নেতৃত্বে কয়েকটি আক্রমণ মোহনবাগানের রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তবে ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই বলের দখল এবং আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে মোহনবাগান। বিশেষ করে সায়নের উপস্থিতি বাঁ প্রান্তে ক্রমশ বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে থাকে। তাঁর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি পাঠচক্রের ডিফেন্ডাররা। একের পর এক আক্রমণে তিনি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছিলেন। শুরুতেই কিয়ান নাসিরি সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে ম্যাচের রূপ আরও আগে বদলে যেতে পারত। আবার সায়নের দুরন্ত ক্রস থেকেও গোল করতে ব্যর্থ হন সুহেল আহমেদ ভাট। প্রথম পনেরো মিনিটেই অন্তত তিনটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল মোহনবাগান। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হয় একুশ মিনিটে। বাঁ দিক দিয়ে দুরন্ত গতিতে বক্সে ঢুকে পড়েন সায়ন। ভারসাম্য হারিয়েও নিখুঁতভাবে বল বাড়িয়ে দেন। পাঠচক্রের গোলরক্ষক সেই বল ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। বল গোললাইনের সামনে চলে আসতেই আর ভুল করেননি কিয়ান নাসিরি। ঠান্ডা মাথায় জালে জড়িয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। গোল পাওয়ার পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে মোহনবাগান। যদিও প্রথমার্ধে আর গোল আসেনি, তবু আক্রমণের ধার বজায় ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও আগ্রাসী মেজাজে নামে সবুজ-মেরুন শিবির। মাঝমাঠ থেকে রাজ বাসফোরের সঠিক পাস এবং দুই প্রান্তের দ্রুত ওঠানামা পাঠচক্রকে চাপে রাখে। পঁয়ষট্টি মিনিটে সেই চাপেরই ফল আসে। রাজ বাসফোরের বাড়ানো বল ধরে রোহিত ডান দিক থেকে নিখুঁত ক্রস তুলতেই পিছন থেকে উঠে এসে ফাঁকা গোলে বল জড়িয়ে দেন সুহেল আহমেদ ভাট। প্রথমার্ধে সুযোগ নষ্ট করলেও দ্বিতীয়ার্ধে নিজের ভুল শুধরে নেন তিনি। এই গোলের পর ম্যাচ কার্যত মোহনবাগানের নিয়ন্ত্রণেই চলে যায়।
যদিও স্কোরলাইন আরও বড় হতে পারত। একবার পাঠচক্রের ডিফেন্ডার গোললাইন থেকে বল ফিরিয়ে না দিলে ব্যবধান আরও বাড়ত। কয়েকটি আক্রমণে শেষ পাসের অভাবও চোখে পড়েছে। তবু বলের গতি, পজিশনাল ফুটবল এবং দুই প্রান্ত ব্যবহার করার পরিকল্পনা স্পষ্ট ছিল। কলকাতা লিগের প্রথম ম্যাচেই দলগত বোঝাপড়ার যে ছবি দেখা গেল, তা কোচিং স্টাফকে নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট করবে। ম্যাচের শেষ দশ মিনিটে আবারও ঝড় তোলে মোহনবাগান। দীর্ঘ সময় ধরে যিনি আক্রমণের প্রাণ ছিলেন, সেই সায়ন অবশেষে নিজের প্রাপ্য গোলটি পেয়ে যান। দুরন্ত গতিতে রক্ষণ ভেঙে গোল করে নিজের পারফরম্যান্সে পূর্ণতা আনেন তিনি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান চার গোলে নিয়ে যান বিভান। শেষ বাঁশি বাজার আগেই পরিষ্কার হয়ে যায়, মরশুমের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী বার্তা দিয়ে রাখল মোহনবাগান।
এই জয়ে যেমন সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে, তেমনই কিয়ান নাসিরির গোল করার মানসিকতা এবং সুহেল আহমেদ ভাটের দ্বিতীয়ার্ধের উন্নত পারফরম্যান্সও উল্লেখযোগ্য। যদিও সুহেলের খেলায় এখনও কিছুটা ধীরগতি চোখে পড়েছে। বল ছাড়া দৌড় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও উন্নতি প্রয়োজন। তবে ম্যাচ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি যে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন, সেটিও ইতিবাচক দিক। মাঝমাঠে রাজ বাসফোরের উপস্থিতি দলকে ভারসাম্য দিয়েছে। আক্রমণ গড়ে তোলা থেকে শুরু করে রক্ষণকে সহায়তা করা, দুই ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রোহিতও ডান প্রান্ত দিয়ে বেশ কয়েকটি কার্যকর আক্রমণ তৈরি করেন। তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের মিশেলে যে দল গড়ে উঠছে, তার প্রাথমিক রূপরেখা এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়েছে।
পাঠচক্রের দিক থেকে দেখলে শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও ম্যাচের গতি ধরে রাখতে পারেনি তারা। প্রথম কুড়ি মিনিটে পাল্টা আক্রমণে কিছুটা বিপদ তৈরি করলেও গোল হজম করার পর ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। দ্বিতীয়ার্ধে শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই পিছিয়ে পড়ে দলটি। রক্ষণে সমন্বয়ের অভাব এবং মাঝমাঠে বল ধরে রাখার অক্ষমতা শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে হারের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কলকাতা লিগ দীর্ঘ প্রতিযোগিতা। একটি ম্যাচ দিয়েই পুরো মরশুমের ছবি আঁকা যায় না। তবু প্রথম ম্যাচে যে ধরনের ফুটবল খেলল মোহনবাগান, তাতে সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়ে গেল। দলের আক্রমণভাগে গতি রয়েছে, সুযোগ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে, আবার একাধিক গোলদাতাও রয়েছে। যদি ফিনিশিং আরও ধারালো হয় এবং মাঝমাঠ একইভাবে ছন্দ বজায় রাখতে পারে, তবে প্রতিপক্ষের জন্য এই দলকে আটকানো সহজ হবে না।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর গ্যালারিতে শুরু হয় উৎসব। সবুজ-মেরুন সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, আলোর ঝলকানি আর পায়রো শো মিলিয়ে যেন নতুন মরশুমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে গেল। মাঠের ভিতরে চার গোলের জয়, মাঠের বাইরে সমর্থকদের আবেগ— দুই মিলিয়ে প্রথম দিনেই সফল মোহনবাগান। আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন নতুন জার্সিতে পুরনো ধার ফিরে পাওয়া সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ঝলমলে পারফরম্যান্সই যেন জানিয়ে দিল, সবুজ-মেরুন শিবিরে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই।
ই-পেপার