নিজস্ব সংবাদদাতা: বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের সই জালিয়াতির মামলায় বড়সড় স্বস্তিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তার রক্ষাকবচের মেয়াদ বৃদ্ধি করল কলকাতা হাই কোর্ট। তবে এই মেয়াদের মধ্যে তদন্তের কাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি। যদিও তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া রিপোর্টে অভিষেককে ‘দোষী’ হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতি কৌশিক চন্দ। সিআইডি-র আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বিচারপতির কড়া মন্তব্য, কারও হাত বেঁধে দেওয়া হয়নি। আপনারা নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে যান, তাতে সমস্যা নেই।বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর কিছু দিনের মধ্যেই এই সই জালিয়াতির বিতর্ক প্রকাশ্যে এসেছিল। শাসকদলের এক দলীয় বৈঠকে বেশ কয়েকজন তৃণমূল বিধায়ক অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বিধানসভার রেজিস্ট্রি খাতায় এবং বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের রেজোলিউশন বুকে তাদের স্বাক্ষর দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে দেখা যায়, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেই বিতর্কিত রেজোলিউশনটি বিধানসভার স্পিকারের কাছে পাঠিয়েছেন অভিষেকই। বিধায়কদের সই নকল করার ঘটনায় অভিষেকের ইন্ধন ছিল, এমন অভিযোগে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে যায়। আদালত সূত্রে খবর, ওই জালিয়াতি মামলারই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে।
মামলার শুনানিতে সিআইডি আদালতের কাছে একটি রিপোর্ট জমা দিয়ে দাবি করে, সই জালিয়াতির ঘটনায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘দোষী’। কিন্তু সিআইডি-র এই তত্ত্বে একেবারেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি হাইকোর্টের একক বেঞ্চ। বিচারপতি কৌশিক চন্দের পর্যবেক্ষণ, দলের বৈঠকে উপস্থিত থাকা বা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হওয়া মানেই নথি জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রমাণ হয় না। গোয়েন্দাদের পেশ করা তথ্যে অসঙ্গতি দেখে বিচারপতি প্রশ্ন করেন, তদন্ত শেষ করতে আর কত সময় লাগবে? ধরে নেওয়া গেল যে সই জাল করা হয়েছে, কিন্তু এতে অভিষেকের নির্দিষ্ট ভূমিকা বা ‘রোল’ কোথায়?’ আদালতে সিআইডি-র পক্ষে সওয়াল করতে উঠে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) রাজদীপ মজুমদার দাবি করেন,দলীয় রেজোলিউশনে সই করেছিলেন মোট ৭০ জন বিধায়ক। কিন্তু তার মধ্যে পাঁচ জন বিধায়ক অভিযোগ তুলেছিলেন যে তারা আদৌ খাতায় সই করেননি। গোয়েন্দাদের দাবি, গত ৬ মে রেজোলিউশন বুকে কোনও স্বাক্ষর করা হয়নি, ১৯ মে স্বাক্ষরগুলি করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর ওই ৫ জনের নমুনা সই পরীক্ষা করানোর জন্য হস্তরেখা ও ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হলে স্পষ্ট হয় যে সইগুলি জাল। এএজি রাজদীপ মজুমদার আদালতে আরও জানান, তদন্তে উঠে এসেছে যে ওই দিন বৈঠকে অভিষেকও উপস্থিত ছিলেন। তাই ভবিষ্যতে মামলায় ফৌজদারি ষড়যন্ত্র বা ১২০-বি ধারাও যুক্ত করা হতে পারে। পাল্টা অভিষেকের আইনজীবী সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় সিআইডি-র রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সওয়াল শুরু করেন। তিনি বেঞ্চের সামনে যুক্তি দেন, ‘আমার মক্কেল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক, তিনি কোনও বিধানসভার বিধায়ক নন। যে সই জালিয়াতির কথা বলা হচ্ছে, সেই বৈঠকে তিনি তো উপস্থিত ছিলেন না। সে দিন সই ও নথিপত্র পরীক্ষা- নিরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সুবাদে শুধুমাত্র প্রশাসনিক নিয়মে রেজোলিউশনটি স্পিকারকে ফরওয়ার্ড করেছিলেন অভিষেক। তবে কেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে তাকে দোষী বলা হচ্ছে? দু’পক্ষের আইনজীবী এবং বিচারপতির দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শেষে বিচারপতি চন্দ স্পষ্ট করে দেন, সিআইডি তদন্ত চালাতে পারবে, তবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপ করা যাবে না। হাইকোর্টের এই নির্দেশের ফলে আপাতত আইনি স্বস্তিতে কালীঘাট শিবির।