ইন্ডিয়ান নিউজ সার্ভিস: ডার্বির যন্ত্রণা ভুলতে ঘরোয়া লিগে নেমেই গোলের বন্যা বইয়ে দিল মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গলের কাছে ডুরান্ড কাপের ডার্বিতে চার এক গোলে হারের ধাক্কায় সবুজ মেরুন শিবিরে যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, জর্জ টেলিগ্রাফের বিরুদ্ধে ছয় শূন্য জয়ে তার অনেকটাই মুছে গেল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল মোহনবাগানের হাতে। এক দিকে আক্রমণের ঝড়, অন্য দিকে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের লাল কার্ডে আরও সুবিধা। সব মিলিয়ে বুধবারের ম্যাচে ছন্দ ফিরে পেল মেরিনার্সরা।
এই জয়ের ফলে কলকাতা লিগে সুপার সিক্সে ওঠার লড়াই আরও জমে উঠল। আট ম্যাচে ষোলো পয়েন্ট নিয়ে ম্যাচের আগে যে দলটি চাপের মধ্যে ছিল, এই বড় জয়ের পরে তারা উঠে এল লড়াইয়ের কেন্দ্রে। গোলের ব্যবধানও বাড়ল। সবচেয়ে বড় স্বস্তি, ডার্বির হারের পরে দলের আত্মবিশ্বাসে যে ধাক্কা লেগেছিল, তার জায়গায় ফিরল গোলের ক্ষুধা। শুরু থেকেই জর্জ টেলিগ্রাফকে চাপে রাখে মোহনবাগান। মাঝমাঠে বলের দখল রেখে দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ গড়ে তুলছিল সবুজ মেরুন। সেই চাপের ফলও বেশি অপেক্ষা করায়নি। ম্যাচের তেরো মিনিটে কিয়ানের মাপা সেন্টার থেকে গোল করে মোহনবাগানকে এগিয়ে দেন সুহেল ভাট। শুরুতেই গোল পেয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে দল। এর পরে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ এসেছিল। কুড়ি মিনিটে মোহনবাগান বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। তবে গোল বাতিল হলেও আক্রমণের গতি কমেনি। বরং আরও ধারালো হয়ে ওঠে সবুজ মেরুনের খেলা।
তেইশ মিনিটে দ্বিতীয় গোল। বাঁ দিক থেকে আসা পাসে দুরন্ত টাচে ডান পায়ের আউটস্টেপ ব্যবহার করে বল জালে পাঠান অ্যালেক্স সাজি। মরশুমে এটাই তাঁর প্রথম গোল। গোলের সৌন্দর্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। সাজির সেই ফিনিশিং জর্জের রক্ষণকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তার কয়েক মিনিট পরেই ম্যাচের মোড় আরও ঘুরে যায়। সাতাশ মিনিটে বিভান জ্যোতি লস্করকে ট্যাকল করে লাল কার্ড দেখেন জর্জ টেলিগ্রাফের অধিনায়ক রণজয় সামন্ত। ফলে বাকি সময় দশ জনে খেলতে হয় জর্জকে। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রিকিক পায় মোহনবাগান। সেট পিস থেকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও বিভান জ্যোতির দুরন্ত শট রুখে দেন জর্জের গোলকিপার বিশ্বনাথ ওরাওঁ। দশ জন হয়ে গেলেও প্রথমার্ধের শেষ দিকে জর্জ টেলিগ্রাফ এক বার পাল্টা আক্রমণে সুযোগ তৈরি করেছিল। তন্ময়ের দূরপাল্লার শটও মোহনবাগানের গোলমুখে বিপদ তৈরি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধে দুই শূন্য ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় মোহনবাগান। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমেই যেন আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে সবুজ মেরুন। বিরতির পরে গোলের জন্য বেশি সময় নেয়নি তারা। সন্দীপ মালিক গোল করে ব্যবধান বাড়ান। তিন শূন্য হয়ে যাওয়ার পরে ম্যাচ কার্যত মোহনবাগানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এর পরেই আসে আর একটি গোল। পঞ্চাশ মিনিটে পরিবর্ত হিসাবে মাঠে নামেন সূর্যবংশী। মাঠে নামার পরেই অভিষেক গোল করে নজর কাড়েন তিনি। চার শূন্য হয়ে যায় ম্যাচের ফল। জর্জের দশ জনের দল তখন কার্যত প্রতিরোধহীন। একের পর এক আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিল তাদের রক্ষণ। পঞ্চান্ন মিনিটে বাঁ দিক থেকে সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে গোলের জন্য আর বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। ছয় মিনিট পর সায়নের থ্রু বল থেকে গোল করেন সুহেল। ম্যাচে তাঁর দ্বিতীয় গোল। মোহনবাগানের ব্যবধান তখন পাঁচ শূন্য। এর পরে সুহেলের সামনে হ্যাটট্রিকের সুযোগও এসেছিল। সাতষট্টি মিনিটে সহজ সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি তিনি। তাতে অবশ্য তাঁর মনোবল ভাঙেনি। কোচ বাস্তব রায় কিয়ান নাসিরিকে তুলে রাজদীপ করকে মাঠে নামান। মোহনবাগান তখনও আক্রমণের ধার কমায়নি। অবশেষে তিয়াত্তর মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। নিজের তৃতীয় গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সুহেল ভাট। ডার্বির হারের পরে যে মোহনবাগানকে নিয়ে সমর্থকদের মনে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই দলই এ দিন ছয় গোল করে দেখিয়ে দিল ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের রয়েছে। সুহেলের হ্যাটট্রিক তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, দলের আত্মবিশ্বাস ফেরানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ছয় শূন্যে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে পয়েন্ট তালিকাতেও মোহনবাগানের অবস্থান শক্ত হল। নয় ম্যাচে একুশ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভবানীপুর। সাত ম্যাচে সতেরো পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ইস্টবেঙ্গল। মোহনবাগান উঠে এসেছে তৃতীয় স্থানে। নয় ম্যাচে পনেরো পয়েন্ট নিয়ে ইউনাইটেড কলকাতা রয়েছে চতুর্থ স্থানে। সুপার সিক্সে ওঠার লড়াইয়ে তাই প্রতিটি ম্যাচ এখন মোহনবাগানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ডার্বির হারের পরে ছয় গোলের জয় সেই লড়াইয়ে নতুন অক্সিজেন দিল। শুধু তিন পয়েন্ট নয়, গোলের ব্যবধান, আক্রমণের আত্মবিশ্বাস এবং তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স—সব দিক থেকেই এই জয় সবুজ মেরুন শিবিরের কাছে বড় স্বস্তির। ডুরান্ডের ক্ষত এক ম্যাচে পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার নয়। কিন্তু ঘরোয়া লিগে এমন দাপুটে জয় সেই ক্ষতে অন্তত ছোট্ট প্রলেপ দিয়েছে। সুহেলের হ্যাটট্রিক সেই প্রলেপকে আরও উজ্জ্বল করেছে। এখন সামনে তাকিয়ে মোহনবাগানের লক্ষ্য একটাই—পরের ম্যাচগুলিতে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সুপার সিক্সের জায়গা নিশ্চিত করা।( ছবি: দেবাশিস ভদ্র)।