সেই কমিশনের রিপোর্ট জমাও পড়েছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট তৃণমূল জমানায় প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ২১ জুলাই সমাবেশের প্রাক্কালে বিধানসভায় সেই কমিশনের রিপোর্ট পেশ করলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রিপোর্ট তুলে ধরে সোমবার বিধানসভায় মু্খ্যমন্ত্রী জানান, “মণীশ গুপ্তের নির্দেশই গুলি চলেছিল। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণিত হয়নি।” সাক্ষীদের তালিকাও তুলে ধরেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ২১ জুলাইকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়েছেন। রাজনৈতিক পদ কিংবা ক্ষমতা নয়, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘোরা। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অনেক সম্পত্তির মালিক হওয়া। ২১ জুলাইকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়েছেন। ২১ জুলাই কী হয়েছিল, এখনও জানে না পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, এন কৃষ্ণমূর্তি, মণীশ গুপ্ত, তুষারকান্তি তালুকদার। কানওয়ালজিৎ সিং, রাজকোমল জুহুরি, দীনেশ বাজপেয়ী, বিমান বসু, প্রদীপ ভট্টাচার্য, মঞ্জুকুমার মজুমদার, কিরণময় নন্দ। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, সৌগত রায়। সব মিলিয়ে ৪৪জনকে কমিশন ডেকেছিল। সবচেয়ে বড় সাক্ষী বলে যিনি দাবি করেন, তাকেই ডাকেনি কমিশন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হয়তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেই দিয়েছিলেন, ডাকবেন না। পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় সাক্ষী দিতে রাজি হননি, জানিয়ে দিয়েছিলেন। ২১ জুলাইয়ে অভিযুক্ত ছিলেন মণীশ গুপ্ত, কিন্তু তাকেই মন্ত্রী করা হয়েছিল। তাই স্বভাবতই ওনার নাম আর প্রকাশ করা হয়নি। আইন অনুযায়ী তদন্ত হয়েছিল বলে কমিশন মনে করে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট, অন্য রিপোর্টের রিপোর্ট অনুপস্থিত ছিল। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণিত হয় না। কার নির্দেশে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, তাও জানা যায়নি। মহাকরণ থেকে কেন নথি পাওয়া যায়নি, তারও জবাব মেলেনি। বিদ্যুৎমন্ত্রী ফেঁসে যেতে পারেন, তাই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথ্য দেননি। কমিশন মনে করেছে, মহাকরণ থেকে বহু দূরে গুলি চালানোর দরকার ছিল না। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, কমিশন নিহতদের পরিবারকে ২৫ লাখ ও আহতদের ৫ লাখ দিতে বলেছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস সরকার মাত্র নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ এবং আহতদের পরিবারকে ১৫ হাজার দিয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার গুলির পাশে থাকার বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলিকে বলব যদি ফ্রেশ এফআইআর করতে চান, সেই সুযোগ বর্তমান সরকার দেবে। আপনারা যদি কমিশনের সুপারিশ মেনে বর্তমান সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য চান, তা দেবে। মুখ্যমন্ত্রী রিলিফ ফান্ড থেকে সেই টাকা দেওয়া হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তত্কালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে মহাকরণ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। বাংলার ক্ষমতায় তখন বামেরা। তৎকালীন যুবকংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবিতে মহাকরণ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল শহর কলকাতা।তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তর নির্দেশে গুলি চলেছিল বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে। তাতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেই একুশে জুলাইয়ের সেই ঘটনার যথাযথ তদন্তের জন্য বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।তারপর পেরিয়েছে ১৫ বছর। রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি। তবে যে মনীশ গুপ্তের নির্দেশে গুলি চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল, তাকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা নিয়ে কংগ্রেস ও বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের মধ্যে ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্টে কি আছে, এই নিয়ে রাজনৈতিক মহলের কৌতূহলেরও শেষ ছিল না। ২১ জুলাই কমিশনের সেই রিপোর্টই সোমবার বিধানসভায় পেশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।