ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে আবেগ বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের পরিবর্তে তথ্য ও ঘটনার ভিত্তিতে একজন মানুষকে মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ, ইতিহাস কেবল মতাদর্শের নয়, সত্যেরও সাক্ষ্য বহন করে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, সংগঠক, আইনজ্ঞ, সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং অসাধারণ প্রশাসক। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও শিক্ষাচিন্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষার প্রসার, গবেষণার উন্নয়ন এবং নতুন নতুন বিষয় চালু করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দূরদর্শী। আজ যাঁরা তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করেন, তাঁদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি উপাচার্য থাকাকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়কে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একজন সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ কখনও একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মর্যাদার সঙ্গে স্থান দেওয়ার উদ্যোগ নিতেন না। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চরিত্রকে গুরুত্ব দিতেন এবং শিক্ষাকে কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চাননি। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মানবিকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলির মধ্যে অন্যতম তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম-এর সম্পর্ক। এই ঘটনাটি আজও অনেকের কাছে অজানা, অথচ এটি তাঁর ব্যক্তিত্বকে বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সময়টা ১৯৪২ সালের জুলাই মাস। বিদ্রোহী কবি নজরুল তখন গভীর শারীরিক ও মানসিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি গুরুতর অসুস্থ। তাঁর স্ত্রী বহুদিন ধরে পঙ্গু অবস্থায় শয্যাশায়ী। মাথার ওপর নেমে এসেছে ঋণের বোঝা। পাওনাদারদের চাপ, আদালতের ওয়ারেন্ট, আর্থিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। এমনকি মানসিক অবসাদ তাঁকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই কঠিন সময়ে তিনি বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তি ও নেতার কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। ঠিক তখনই তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি নিজে নজরুলের বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, অসুস্থ কবি মেঝেতে শুয়ে আছেন। কথা বলার শক্তিও তাঁর নেই। কাগজে লিখে তিনি নিজের অসহায় অবস্থার কথা জানান। সেই দৃশ্য দেখে শ্যামাপ্রসাদ গভীরভাবে মর্মাহত হন। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে কবির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। সপরিবারে নজরুলকে মধুপুরে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন, যেখানে উন্নত পরিবেশে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, সেই সময় তিনি কবির হাতে ৫০০ টাকা তুলে দিয়ে উদারতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। মধুপুরে চিকিৎসা ও বিশ্রামের ফলে নজরুলের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কৃতজ্ঞতায় তিনি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি জানান যে মধুপুরে এসে তাঁর মাথার যন্ত্রণা কমেছে, শরীর কিছুটা সুস্থ হয়েছে। তিনি আরও লেখেন, শ্যামাপ্রসাদ যদি এত দ্রুত ব্যবস্থা না করতেন, তাহলে হয়তো তাঁর পরিণতিও মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর মতো হাসপাতালে মৃত্যু হতো। ন একই চিঠিতে তিনি স্ত্রীর দীর্ঘ অসুস্থতা, প্রায় সাত হাজার টাকার ঋণের বোঝা এবং সংসারের দুঃসহ অবস্থার কথাও উল্লেখ করেন। পরে রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও তাঁদের মধ্যে পত্রালাপ চলতে থাকে।
এই সম্পর্ক নিয়ে বিশিষ্ট নজরুল গবেষক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর লেখায় বিশদ আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ কেবল একবার নয়, একাধিকবার বিভিন্নভাবে নজরুলকে সাহায্য করেছিলেন। এই তথ্য নিছক একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিবরণ নয়; এটি একজন মানুষের মানবিক চরিত্রের পরিচয় বহন করে। যদি কেউ সত্যিই ধর্মীয় বিদ্বেষে বিশ্বাস করতেন, তবে তিনি কি একজন মুসলিম কবির দুর্দিনে তাঁর পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব নিয়ে এভাবে পাশে দাঁড়াতেন? একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর বক্তৃতায় নয়, সংকটের মুহূর্তে তাঁর আচরণে প্রকাশ পায়। সেই বিচারে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এই মানবিক উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অবশ্য এটিও সত্য যে, ইতিহাসে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নানা মত রয়েছে। বিশেষ করে দেশভাগ, জাতীয়তাবাদ, সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং তৎকালীন রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে একজন মানুষের মানবিক অবদান বা শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্বকে অস্বীকার করা উচিত নয়। আবার একইভাবে, তাঁর অবদান তুলে ধরতে গিয়ে ইতিহাসের সব বিতর্ককেও অস্বীকার করা সমীচীন নয়। ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নই ইতিহাসচর্চার মূল শর্ত।
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসেও ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। অনেক গবেষক মনে করেন, দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ হিসেবে রক্ষা করার প্রশ্নে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই কারণেই অনেকে তাঁকে "পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম রূপকার" বলে উল্লেখ করেন। যদিও এই মূল্যায়ন নিয়েও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে, তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে স্বাধীনতার উত্তাল সময়ে তিনি বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নতুন করে জানার প্রয়োজন রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক প্রচার বা বিরোধিতার চোখ দিয়ে নয়, বরং তাঁর শিক্ষা-সংস্কৃতি ভাবনা, প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবিকতা এবং জাতীয় জীবনে তাঁর অবদানকে তথ্যভিত্তিকভাবে বিচার করা উচিত। ইতিহাসের কোনো চরিত্রই একমাত্রিক নন। তাঁদের আলো-ছায়া মিলিয়েই প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব।
আজ, তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন রাজনীতিবিদকে স্মরণ করা নয়; একজন শিক্ষাবিদ, একজন মানবিক সমাজচিন্তক এবং বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক সাহসী ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা। কাজী নজরুল ইসলামের দুর্দিনে তাঁর নিঃস্বার্থ সহায়তা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির পাঠ্যক্রম চালুর মতো উদার উদ্যোগ এবং শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাঁর স্বপ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষকে বিচার করার আগে তাঁর সমগ্র জীবনকে দেখা প্রয়োজন।
ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই জানানো সম্ভব, যখন আমরা পূর্বধারণার পরিবর্তে তথ্যকে গুরুত্ব দিই। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। তাঁর অবদান নিয়ে গবেষণা হোক, বিতর্ক হোক, মতভেদ থাকুক—কিন্তু তা যেন সত্য, যুক্তি এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষ আলোয় হয়। তবেই আগামী প্রজন্ম একজন পূর্ণাঙ্গ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে জানতে পারবে এবং ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাও যথার্থভাবে পালন হবে।বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিপক্ষ পালিত হচ্ছে। এই উদ্যোগ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়, বরং আগামী প্রজন্মের সামনে তাঁর জীবন, কর্ম, শিক্ষাদর্শ, মানবিকতা এবং জাতীয় জীবনে তাঁর বহুমাত্রিক অবদানকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়ন কখনোই রাজনৈতিক মতাদর্শের সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং তা হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ ও যুক্তিসম্মত। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন আমাদের শেখায়—শিক্ষা, মানবিকতা, সাহস এবং দেশসেবার আদর্শই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। তাই নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানুক, ইতিহাসের আলোয় তাঁকে বিচার করুক এবং তাঁর প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা নিবেদন করুক—এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়। তবেই স্মৃতিপক্ষ পালন কেবল একটি অনুষ্ঠান হয়ে থাকবে না, বরং ইতিহাসচর্চা,মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় চেতনাকে সমৃদ্ধ করার এক অর্থবহ উদ্যোগে পরিণত হবে।