দড়ি থেকে সৌখিন পণ্য, সাবাই ঘাসের হস্তশিল্প খতিয়ে দেখতে ঝাড়গ্রামে ইউনেস্কো
স্বপ্নীল মজুমদার( ঝাড়গ্রাম): ঝাড়গ্রামের সাবাই (বাবুই) ঘাসের হস্তশিল্প এখন আর শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। হাতব্যাগ, ঝুড়ি, ট্রে, ল্যাম্পশেড, ডাস্টবিন, ফুলের টবের কভার-সহ নানা ধরনের গৃহসজ্জার সামগ্রী পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সেই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চলা প্রকল্পের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে রবিবার ও সোমবার জেলার দুটি সাবাই ঘাসের হস্তশিল্প কেন্দ্র পরিদর্শন করলেন ইউনেস্কোর মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার চিরঞ্জিত গঙ্গোপাধ্যায়, রাজ্য সমন্বয়কারী আশুতোষ সামল, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প ও বস্ত্র দফতরের অধীনস্থ ঝাড়গ্রাম জেলা শিল্পকেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার প্রসূনকুমার ঘোষ, খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের জেলা আধিকারিক অশোক দাস এবং প্রকল্পের কার্যকরী সহযোগী সংস্থা 'কদম'-এর কর্মসূচি ও কৌশল বিভাগের প্রধান লুবনা মেলজার-সহ প্রতিনিধিরা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প ও বস্ত্র দফতরের সহযোগিতায় ইউনেস্কোর উদ্যোগে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে 'রুরাল ক্র্যাফ্ট অ্যান্ড কালচারাল হাব-২' (আরসি সিএইচ-২) প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় ঝাড়গ্রাম জেলার সাবাই ঘাসের হস্তশিল্পীদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নকশার পণ্য তৈরি, পরিবেশবান্ধব অ্যাজো-মুক্ত রং ব্যবহার, গুণমান নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধি, আকর্ষণীয় মোড়কীকরণ, অনলাইন বিপণন এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দিল্লি, কলকাতাসহ বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনী ও বিপণনের সুযোগও করে দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই জেলার একাধিক কারিগর দিল্লির প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে তাঁদের তৈরি সামগ্রী বিক্রি করেছেন। রবিবার নয়াগ্রাম ব্লকের চাঁদাবিলা গ্রাম পঞ্চায়েতের রাইশোল এবং সোমবার ঝাড়গ্রাম ব্লকের মানিকপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়বাড়ি হস্তশিল্প কেন্দ্র ঘুরে দুই দিনে প্রায় ১১৫ জন কারিগরের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রতিনিধিরা। কারিগররা জানান, প্রশিক্ষণের ফলে নতুন নকশার পণ্য তৈরি, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, গুণমান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং অনলাইন বিপণনের ক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা বেড়েছে। পরিবেশবান্ধব অ্যাজো-মুক্ত রং ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমার পাশাপাশি পণ্যের মানও উন্নত হয়েছে। প্রশিক্ষণে তৈরি নতুন পণ্যের অর্ডারও মিলতে শুরু করেছে বলে জানান তারা। নয়াগ্রামের কুকড়াশোল গ্রামের সাবাই শিল্পী চন্দনা দাস বলেন, ‘‘প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাজ করছি। ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা আমাদের কাজ দেখেছেন, সমস্যার কথা শুনেছেন। এতে আমরা আরও উৎসাহ পেয়েছি। বড়বাড়ি গ্রামের কারিগর মঞ্জু মাহাতো বলেন, আমাদের গ্রামকে হস্তশিল্পভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। পর্যটকদের জন্য স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি হলে বাজার বাড়বে, আমাদের আয়ও বাড়বে। 'কদম'-এর কর্মসূচি ও কৌশল বিভাগের প্রধান লুবনা মেলজার বলেন, ‘‘এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন পণ্য তৈরিতে কারিগরদের দক্ষ করে তোলা। নকশাগত উন্নয়ন, বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং উদ্যোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে ঝাড়গ্রামের সাবাই ঘাসের হস্তশিল্পকে আরও বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। কারিগররা কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (সিএফসি), কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং বর্ষাকালে সাবাই ঘাস শুকানোর উন্নত পরিকাঠামোর দাবি জানান। পরে জেলা শিল্পকেন্দ্রে পর্যালোচনা বৈঠকে চাঁদাবিলায় একটি কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার গড়ে তোলা এবং 'ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট, ওয়ান প্রোডাক্ট' উদ্যোগের সঙ্গে সাবাই ঘাসের হস্তশিল্পকে যুক্ত করে ঝাড়গ্রামকে হস্তশিল্পভিত্তিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।