শনিবার রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় রাজ্য সরকারের তরফে। শনিবারের সেই অনুষ্ঠানেই গোলমালের সৃষ্টি হয় কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে ডেকে নেওয়ার সময়। হট্টগোলের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত তাকে নেমে যেতে হয় মঞ্চ থেকে। সেই ঘটনায় রবিবার দুঃখপ্রকাশ করে বাক স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, কারও কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া কখনওই উচিত নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং প্রত্যেক মানুষের নিজের মত প্রকাশের অধিকার থাকা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে তিনি কবি জয় গোস্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, তাকে অসম্মান করা মানে আমাকেও অসম্মান করা। তসলিমা বলেন, শুধু জয়কে অপমান করা হয়নি, আমাকেও অপমান করা হয়েছে। কারণ, আমি জয়কে ডেকেছিলাম। তিনি বলেন, আমি যে ভাষণ দিয়েছিলাম, সেখানে বাক স্বাধীনতার কথা বলেছিলাম। সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে। কারও কথা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক না। তার কথায়, যারা আমার কথা পছন্দ করেছিলেন, তাদের মধ্যে কি তারা ছিলেন, যারা তাকে মঞ্চে উঠতে দেয়নি। তা হলে দু’রকম বিষয় হলো। একজন যখন মতপ্রকাশের কথা বলছেন, তখন সমর্থন করছি। অথচ, বাস্তবে এক কবিকে ডাকা হলে তার কথা শুনতে চাইছি না। এটা ঠিক নয়। তার কথায়, কলকাতা প্রগতিশীলদের শহর। এখানে সবাই বাক্স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করেন বলেই আমি বিশ্বাস করতে চাই। কারও রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু সকলকেই মতপ্রকাশের জায়গা দিতে হবে। এর পাশাপাশি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষেও সওয়াল করেন তসলিমা। তিনি বলেন, সমান অধিকারের ভিত্তিতে একটি দেশের সকল নাগরিকের জন্য একই আইন থাকা উচিত। তার মতে, শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রয়োজন। "এক দেশ, এক আইন" নীতি নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কড়া মন্তব্য করেন তসলিমা। তার দাবি, শেখ হাসিনার সরকার এবং বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই। তিনি অভিযোগ করেন, কোনও সরকারই মুক্তচিন্তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয় না বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দু নারীদের অধিকার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তসলিমা। তার অভিযোগ, সেখানে বহু ক্ষেত্রে হিন্দু নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন এবং বৈষম্যের শিকার হন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ভারতেও মুসলিম নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হন। নারী-পুরুষের সমান অধিকারের দাবিতে তার লড়াই ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তসলিমা নাসরিন। তার মতে, রাষ্ট্র ও ধর্মকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মাদ্রাসায় উগ্রপন্থী মতাদর্শের প্রসার ঘটে এবং কোথাও কোথাও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও সামনে আসে। যদিও তিনি সব মাদ্রাসার বিরুদ্ধে মন্তব্য করেননি, বরং কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছেন।